আকর্ষিত শিল্পীচিত্ত
এক
“হে প্রাচীন কাণ্ডারী মৃত্যু,
তোমার আশায় ফেনায়িত বিষের আরক
শেষ বিন্দু পর্যন্ত পান করতে দাও আমাদের।
আমাদের চিন্তাকে প্রদীপ্ত করতে চাই এই আগুনে
স্বর্গ হোক নরক হোক, আমরা
অতল গুহার তলায় পৌঁছতে চাই,
কী আসে যায়, অজানায়
দেখতে চাই নতুন জীবনকে, নতুন দেবতাদের।
—বদলেয়ার
‘শিল্পী অভিযাত্রা করেন অনুভূতির নতুন নতুন সমুদ্রে। জ্ঞানে যে বাস্তবলোক আয়ত্ত হয়, তার শক্ত ভূমিতল শিল্পীর পায়ের নীচে থাকে না। শিল্পী অতি অস্থির, উত্তেজিত হয়ে ওঠেন।
‘সৌন্দর্য’—ক্রিস্টফার কডওয়েল।
স্বপ্ন ও বাস্তবের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে সে সম্পর্কে পিসারভ লিখেছিলেন:
‘ব্যবধান একাধিক। আমার স্বপ্ন (প্রথমত) স্বাভাবিক ঘটনাস্রোতকে ছাড়িয়ে চলে যেতে পারে সামনে, কিংবা (দ্বিতীয়ত) এমন একদিকে আড়াআড়িভাবে ছিটকে চলে যেতে পারে যে স্বাভাবিক ঘটনাস্রোত কোনদিনই সেমুখো হবে না।
প্রথম ব্যাপারটা যদি ঘটে, তাতে আমার স্বপ্ন কোন ক্ষতি করবে না; শুধু তাই নয়; আমার স্বপ্ন মেহনতী মানুষের প্রাণশক্তিকে সাহায্য করবে, উদ্দীপিত করবে। এ স্বপ্নে এমন কিছু নেই যা শ্রমশক্তিকে বিকৃত বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত করতে পারে। তাতো নেই-ই, বরং মানুষ যদি এই ভাবের স্বপ্ন দেখা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হতো, যদি মাঝে মাঝে স্বাভাবিক ঘটনাস্রোতকে ছাড়িয়ে গিয়ে যে বস্তু তার হাতে সবেমাত্র গড়ে উঠছে তার সমগ্র ও সম্পূর্ণ রূপকে ফুটিয়ে তুলতে না পারতো, তাহলে আমার তো ধারণাতেই আসে না মানুষ শিল্পকলা, বিজ্ঞান এবং লৌকিক ক্রিয়াকর্মে বিস্তৃত ও আয়াস-সাধ্য কাজ হাতে নেবার এবং সম্পন্ন করার উৎসাহ পেত কোথা থেকে।...স্বপ্ন ও বাস্তবের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে তা’ কোন ক্ষতিই করেনা যদি যে লোক স্বপ্ন দেখে, তার সত্যকার বিশ্বাস থাকে সে স্বপ্নে, যদি সে জীবনকে সর্বান্তঃকরণে লক্ষ্য করে এবং তার অভিজ্ঞতাকে আকাশকুসুমের সাথে মিলিয়ে দেখে, অর্থাৎ সাধারণভাবে বলতে গেলে সে যদি তার কল্পলোক বাস্তবায়িত করার জন্য কাজ করে যায় সচেতনভাবে। স্বপ্ন ও জীবনের মধ্যে যদি কোন সম্পর্ক থাকে, তবেই সবকিছু শুভ হয়।
—লেনিন কর্তৃক তাঁর কি করিতে হইবে গ্রন্থে ‘স্বপ্ন দেখতে চাই’ নুচ্ছেদে উদ্ধৃত।
‘শিল্পকলা মানবচরিত্রের একটি বন্য এবং নিয়ন্ত্রণবিরোধী দিক থেকে উৎসারিত হয়। শিল্পী এবং হুকুমনবীশের (Bureaucrat) মধ্যে সদাসর্বদাই এক গভীর পারস্পরিক বৈরীতা থাকতে বাধ্য; এব্যাপারে বহুকালব্যাপী সংগ্রামে শিল্পী সদাসর্বদা প্রকাশ্যত পরাভূত হলেও শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়। শিল্পী মানবসমাজের জীবনে যে আনন্দ সঞ্চারিত করে, সেজন্য মানবসমাজ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। এই কৃতজ্ঞতাতেই শিল্পীর জয়। মানব-প্রকৃতির বন্য দিকটির যদি পরোপকারব্রতী অবুঝ আমলাতন্ত্রীর সুশৃঙ্খল নিয়মে চিরকালের জন্য বশীভূত করা হয়, তাহলে বাঁচবার তাগিদমাত্রই ক্রমে ক্রমে শুকিয়ে মরে যাবে। বিভীষিকায় ভরা বর্তমান জগৎ যদি হাজার গুণ খারাপ হয় তবুও তা উপরোক্ত প্রাণহীন বিশ্ব-শবদেহের চাইতে শ্রেয়ঃ। যে রাষ্ট্রিক সমাজতন্ত্র স্বতোৎসারিত ও মুক্ত চিত্তকে নিয়মের নিগড়ে বাঁধে, তার চাইতে শত ক্ষতির সম্ভাবনা সত্ত্বেও নৈরাজ্যবাদী সমাজ ভাল। সাধারণত এই নিয়মের দুঃস্বপ্নই শিল্পীদের এবং সাধারণভাবে সৌন্দর্যপ্রিয় লোকদের সমাজতন্ত্র সম্বদ্ধে সন্দিগ্ধ করে। কিন্তু সমাজতন্ত্রের সারসত্তার মধ্যে এমন কিছু নেই যা শিল্পকলাকে অসম্ভব করে তুলতে পারে। সমাজতন্ত্রের কোন কোন বিশেষ ব্যবস্থাতেই শুধু এ বিপদ দেখা দিতে পারে। উইলিয়াম মরিস সমাজতন্ত্রী ছিলেন। তিনি শিল্পী ছিলেন বলেই প্রধানত সমাজতন্ত্রীপন্থী হয়েছিলেন। এ ব্যাপারে অযৌক্তিক কাজ করেননি তিনি।
কোন বিশেষ ব্যবস্থার দৌলতে নয়, একমাত্র স্বাধীনতাতেই শিল্পকলা বিকশিত হতে পারে। অতএব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এ জন্যে বিশেষ সুবিধার বরাদ্দ থাকা দরকার। সমগ্রভাবে দেখতে গেলে, ধনিকতন্ত্রী সমাজের তুলনায় সুবিবেচক সমাজতন্ত্র শিল্পী ও বিজ্ঞানীকে দিতে পারে লক্ষগুণ বেশি সুবিধা। কিন্তু এই দেওয়াটা নির্ভর করে কি ধরনের আনুকূল্যময় সমাজতন্ত্র বেছে নেওয়া হচ্ছে এবং তাতে উল্লেখিত সুবিধার কি ব্যবস্থা হচ্ছে তার উপর।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments